Header Ads

ফ্রাঞ্চাইজি থিয়েটারের রাহুগ্রাসে মফস্বল


ফ্রাঞ্চাইজি থিয়েটারের রাহুগ্রাসে মফস্বল

টলি বাংলা ওয়েব ডেস্ক
মাসখানেক আগে জলপাইগুড়িতে অনুভব নাট্য সংস্থার আমন্ত্রণে গিয়েছিলাম। সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের বাইরে একটি টিভি চ্যানেলে সাক্ষাৎকারে অন্য নানান প্রশ্নের মধ্যে একটি প্রশ্ন ছিল, উত্তরবঙ্গের থিয়েটারের সঙ্গে দক্ষিণবঙ্গের থিয়েটারের মূল তফাৎটা কোথায়?
কদিন আগে রায়গঞ্জে জাগরীর কর্ণধার শান্তনুও একটি প্রশ্ন করে বললেন, তফাৎ ঘোচাবার উপায় কি ?
সাধারণভাবে বলতে গেলে আমার প্রশ্ন হলো, থিয়েটারে তফাৎ থাকলেও সাহিত্য শিল্পের অন্যদিকে তো তেমন তফাৎ চোখে পড়ে না। উত্তরবঙ্গের কথাশিল্প,কাব্য কবিতা পাঠ করলে বোঝার উপায় নেই যে এটা সংস্কৃতির রাজধানীর মান স্পর্শ করেনি।

উত্তরবঙ্গে এমন অনেক নাট্যকার, নাট্যপরিচালকদের আমি জানি যারা শিক্ষার ক্ষেত্রে বা মানে এমন কি মৌলিকতায় পিছিয়ে পড়েন নি। উত্তরবঙ্গের অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীদের প্রতিভা আমাকে চমকিত করে।

আমি কলকাতায় জন্মেছি বা আমার কাজ কলকাতার কর্মশালায় চলে বলে উত্তরের কাজকে ছোট নজরে দেখি না। ভারতবর্ষের বিভিন্ন রাজ্য এমনকি দেশের বাইরেও নানা ভাষার থিয়েটার দেখার অভিজ্ঞতা থেকে বলতে পারি বাংলার বিভিন্ন জেলায় যেসব কাজ চলছে তা ফালতু নয়।

তারমানে তফাৎ যে নেই তা তো নয়। গত ৮-১০ বছর আগের বাংলা থিয়েটারের সঙ্গে আজকের থিয়েটারের আসমান জমিন তফাৎ প্রকট হয়ে উঠেছে। নাট্য আন্দোলন শব্দটা আজকাল উচ্চারণ হয় না। থিয়েটার যে নিজে সবরকম প্রতিষ্ঠানবিরোধী একটা চরিত্র বা কনসেপ্ট এটাই তো ভুলিয়ে দেওয়া চলছে। নাট্য শিল্পীরা যে রঙ্গমঞ্চের পাটাতনে টিনের তরোয়াল হাতে সমাজের সব রকম অনাচারের বিরুদ্ধে লড়ে যায় এই সত্যটাও বিস্মৃত হচ্ছি আমরা।

যদি প্রশ্ন ওঠে যে কলকাতা বা সন্নিহিত বাংলা থিয়েটার কি আগের মান অতিক্রম করে নতুন দিশা দেখাচ্ছে ?
তা তো নয়। গিরিশ বা শিশির পরবর্তী যুগে উৎপল দত্ত, শম্ভু মিত্র, অজিতেশ বাবুরা আধুনিক বাংলা থিয়েটারের যে আন্তর্জাতিক মানোন্নয়ন ঘটিয়েছেন সেই প্রবাহ তো থেমে গেছে।

ছোট নাটক একাঙ্ক নাটকের প্রবাহেও সত্তর, আশী, নব্বইয়ের দশকে যে সব দল ও নাটকের অস্তিত্ব ছিল তাও তো অস্তমিত। এক-দেড়শো দল ও নাটকের উল্লেখ করা যায় যা বাংলা থিয়েটারের অমূল্য সম্পদ।

বাংলার জমি একসময় শিল্পের নন্দনকানন ছিল। নানা সময় মত্ত হস্তির তাণ্ডবে নন্দনকানন ক্ষতিগ্রস্থ হত। তবুও দ্রুত নতুন ভাবে জেগে উঠতে সময় লাগত না। কারণ শিল্পের জমি ছিল উর্বরা। আজ নানান কারণে জমি বন্ধ্যা হয়ে গেছে। প্রতিভার চাষাবাদ থেমে গেছে। কিছু উন্মাদ অভ্যাস বশে থোর বড়ি খাড়ার আবর্তে চলছে।

উত্তরের মত দক্ষিণের অসংখ্য নাট্যকর্মী বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস বা ঐতিহ্যের খবর রাখে না। কেন থিয়েটার, থিয়েটারের সঙ্গে সমাজ বা নাগরিকদের সম্পর্ক কি এমন সাধারণ প্রশ্নগুলোর কোনো উত্তর পাওয়া যাবে না। সিনেমা বা সিরিয়ালে নামার মই হিসেবে অনেকে থিয়েটারকে দেখে। দলগুলো সরকারি গ্রান্ট শিকারে ঘুরছে। সরকারের কৃপাদৃষ্টি পেতে মেরুদণ্ড ভেঙে বিবেক বিসর্জন দিতেও তৈরি অনেকে।

ফলতো নীতিহীনতা আজকের থিয়েটারের ফ্রাঞ্চাইজি পাওয়া দল বা নাট্যকর্মী রঙ্গমঞ্চের পাটাতনে শিল্পোত্তীর্ণ প্রযোজনা করবে এসব কি ভাবা যায় ?

কেউ কেউ বলেন, কলকাতায় যেসব আলোর সরঞ্জাম, আলোকশিল্পী, সাউন্ড স্টুডিও সহ অন্যান্য টেকনিক্যাল উপাদান সুলভ তা উত্তরবঙ্গে অমিল।সুতরাং উত্তরের থিয়েটার মূলত এইখানে পিছিয়ে রয়েছে।
তারা এও বলেন, কলকাতায় থিয়েটার করার আদর্শ পরিবেশ রয়েছে। অনেক হল, অনেক দর্শক, প্রচার যন্ত্রগুলো সুলভ। প্রভুত টাকা পয়সাও পাওয়া যায়। এও বলা হয়, কলকাতায় নাকি শিক্ষিত নাট্যকর্মী বা প্রতিভার প্রাচুর্য রয়েছে। এসব কু যুক্তি দেখিয়ে উত্তরের থিয়েটারকে কনডেম করা হয়।

কোন দেশ বা রাজ্য বা সমাজের উন্নয়ন মানে আলো ঝলমলে রাজপথ, ফ্লাইওভার, শপিং মল নয়। মানব উন্নয়নের অন্য নিরিখ ধান্দাবাজ শাসকরা গোপন করে রাখে। একই ভাবে বলা যায় - আলো, শব্দ, দৃশ্যসজ্জার চোখ ধাঁধানো আঙ্গিকের পুঁজিতে আদর্শ থিয়েটার গড়ে ওঠে না। উন্নত থিয়েটারের বৈভব তার বহিরঙ্গের চাকচিক্যে নয়। আঙ্গিকের চমৎকারিত্বে চোখে লাগে ধাঁধা। বিষয়ের বলিষ্ঠতায় মন পায় পুষ্টি। দেহ পায় বল।

আমার মনে হয় উত্তরের নাট্যকর্মীরা কলকাতার মুখাপেক্ষী না হয়ে নিজেদের বিশ্বাস ও বোধশক্তিতে কাজ করুন। উত্তরের লোক-নাট্যের সমৃদ্ধ ঐতিহ্যের সন্ধান করুন।
বিশ্ব থিয়েটারের আধুনিক শিল্প কর্মীরা বলছেন, প্রসেনিয়াম থিয়েটার বিকাশের চরম পর্যায়ে চলে গেছে। প্রসেনিয়াম থেকে নতুন কিছু পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। বরং থিয়েটারের ক্যানভাসটাকে প্রসারিত করতে গেলে রঙ্গমঞ্চের বাইরে আসতে হবে।

বাণিজ্যিক থিয়েটার কোন দিন থিয়েটারের মানোন্নয়ন ঘটায় নি। থিয়েটারের মুক্তি কোটি টাকার বাজেটে নয়। থিয়েটার বাঁচে জনতার মুখরিত সখ্যে। পেশাদারী দক্ষতা ও থিয়েটার শিল্পের সুশিক্ষিত নাট্যকর্মীরাই থিয়েটার এর মানোন্নয়ন ঘটাতে পারেন - তীব্র রাজনৈতিক, অর্থঃসমাজ নৈতিক গণসংগ্রামের ময়দানে।

আবারও বলছি, কলকাতার প্রতি মোহ ত্যাগ করুন। কলকাতার লোকজন চর্বিত চর্বন ঘোঁট পাকানো কাজ শেখাচ্ছে আপনাদের। আত্মশক্তিতে ভর করে মাথা তুলে দাঁড়ান। ইন্টারনেটের যুগে বিশ্ব থিয়েটারের হালহকিকত জানা আজকের দিনে অসম্ভব নয়। তাহলে বুঝবেন, কলকাতা কত পিছিয়ে পড়েছে। ওখানে একজন সফদার হাশমিও এখন জন্মায় না। কলকাতাকে অগ্রাহ্য করেই হাবিব তনবীর, রতন থিয়ামরা বিশ্ব জয় করেছেন।

সুব্রত কাঞ্জিলালের ছবি "বিপন্ন সময়" দেখুন এই লিঙ্কে ক্লিক করে

নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি আমার জনৈক আমেরিকান বন্ধু ভারতে এসেছিলেন থিয়েটার বিষয়ে গবেষণার কাজে। তিনি আমার সঙ্গে বাংলা থিয়েটারের স্বাদ নিয়ে বলেছিলেন, তোমাদের কলকাতার একাডেমী কেন্দ্রিক থিয়েটার বিশ্ব থিয়েটারের চলতি প্রবাহের পাশে পিছিয়ে পড়েছে। তবে হাটে, মাঠে, ময়দানে ছোট নাটকের দলগুলো অনেক সজীব ও জীবন্ত।

তবে হ্যাঁ, প্রকৃত আধুনিক থিয়েটারের বৈজ্ঞানিক শিক্ষার বড় অভাব রয়েছে। NSD থেকে বেরোনো ছাত্ররা বড় যান্ত্রিক। অহংকারে তাদের মাটিতে পা পড়ে না। এরা ভুল পথে নিয়ে যাচ্ছে তরুণ প্রজন্মকে। একইভাবে নাট্য প্রতিযোগিতার বিচারক ও সমালোচকদের বড় অংশ অশিক্ষিত ও কুপমুণ্ডক। এরাও বাংলা থিয়েটারের বারোটা বাজাচ্ছে। এদের কেউ কেউ উত্তরে ঠেক গেড়েছে দক্ষিণ থেকে তাড়া খেয়ে।

থিয়েটারকে বাঁচতে গেলে উত্তর-দক্ষিণ সর্বত্র প্রথমে বিনয়ী ছাত্রর মতো সুশিক্ষিত হতে হবে। সব রকম ফ্যাসিবাদী শক্তির বিরুদ্ধে মজুর শ্রেণীর গণ আন্দোলনের শরিক হতে হবে। সুনিবিড় ইতিহাসের পাঠ চলবে।

মনে রাখতে হবে, "চার্লি চ্যাপলিন", "ব্রেখট", "রোমা রোঁলা", "স্তানিস্লাভস্কি", "রবীন্দ্রনাথ", "পিসকাটর", "উৎপল দত্ত"রা তীব্র সাম্রাজ্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ বিরোধী সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তাদের শিল্পকর্মের রসদ সংগ্রহ করেছেন। এঁরা শিল্পের জন্য শিল্প তত্ত্ব স্বীকার করতেন না।

সব রকম শিল্পকর্মীদের লোয়ারডেফথে থাকা মানুষের আত্মীয়তা অর্জন করতে হবে। কলকাতার ভন্ড আঁতেলরা জীবনের শত্রু। সমাজের ত্রাস।

প্রতিবেদন ঃ সুব্রত কাঞ্জিলাল


সুব্রত কাঞ্জিলালের ছবি "বিপন্ন সময়" দেখুন এই লিঙ্কে ক্লিক করে


Credit
Photo : Collected

For the all News Update Please follow our Website www.tollybangla.com
Subscribe our Youtube Channel Tolly Bangla Youtube
Follow Us on Twitter Tolly Bangla twitter
Like our Facebook Page Tolly Bangla Facebook Page


( প্রিয় পাঠক / পাঠিকা , পোস্টটিতে  লাইক, মন্তব্য ও শেয়ার করুন এবং নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের পেজে লাইক করুন )

No comments

Powered by Blogger.