Header Ads

পুঁজির ফাঁসে থিয়েটার


পুঁজির ফাঁসে থিয়েটার

টলি বাংলা ওয়েব ডেস্ক
কোন কোন যুবক এরা নিজেদের নাট্যকর্মী বলেন, অধীর হয়ে উঠেছেন - বাংলা থিয়েটারকে বাণিজ্যিক বিনোদিনী থিয়েটারে রূপান্তর ঘটাতে। এদের যত রাগ গণনাট্য ও গ্রুপ থিয়েটারের উপর।

থিয়েটার করে নাট্যকার থেকে শুরু করে সবাই মোটা রোজগার করবে, দামি ফ্ল্যাট, গাড়ি হবে এতো ভালো কথা। সীমাহীন বেকার বাহিনীর কয়েকজনের হিল্লে হবে - এটা সবাই চায়। অর্থনৈতিক চাপ মুক্ত হয়ে দুনিয়া কাঁপানো থিয়েটার সৃষ্টি হবে তাতে বিরোধ করার কারণ দেখি না।

কথা হলো কিভাবে সেটা সম্ভব ?
হাতিবাগানি বাণিজ্যিক থিয়েটার তো ছিল। ফিল্মস্টারদের এনে নাটক জমানোর চেষ্টা ছিল। উত্তম কুমার, বিশ্বজিৎ, সাবিত্রী, সুপ্রিয়া, জহর রায়, ছবি বিশ্বসেরা নিয়মিত অভিনয় করেছেন। সামাজিক, পৌরাণিক কত নাটকে চমকে দেওয়া মঞ্চসজ্জা থাকতো। সবাই ছিলেন মাস মাইনের কর্মচারী। খুব বেশি দিন চলল না। রাজবিহারী সরকার মনোরঞ্জনের নতুন উপাদান ক্যাবারে আমদানি করেও ফেল মারলেন।

গিরিশ ঘোষকেও সরকারি চাকরি করতে হয়েছে। সে যুগেও দু-চারটি নাটক ভালো সেল দিলেও ব্যবসা হতো না। সরকারিনা মঞ্চটাকে একটা সময় ব্রথেলের নব সংস্করণ করেও অমর ঘোষ ব্যবসা জমাতে পারেন নি।

গিরিশ যুগে লম্পট জমিদারবাবু বা তাদের ছেলেরা পতিতা সংগ করার জন্য থিয়েটারে টাকা ঢালত। থিয়েটার প্রেম বা ব্যবসা করার মানসিকতা ছিল না তাদের।

সিনেমায় যেমন অন্ধকারের লোকেরা টাকা ঢেলে এসেছে। হাজি মস্তান, দাউদ, ছোটা রাজন বা পেট্রো ডলারের দাপট চলে মুম্বাইতে। বাংলায় সারদা, রোজভ্যালি দাপট।
তবে নিউ থিয়েটার্সের ভূমিকা ব্যতিক্রমী

আসামে ভ্রাম্যমান থিয়েটার বাণিজ্যিক। কোটি টাকা লগ্নি হয়। ব্যবসা হয় না। কালো টাকার স্রোতে কিছু টাকা সাদা হয় মাত্র। জীবনের সত্য চাপা পড়ে থাকে। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় পেশাদার থিয়েটার করতে গিয়ে মুনাফা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়েছেন।



উৎপল দত্তর থিয়েটার রাতের পর রাত হাউসফুল দেওয়ার পরেও সেই রকম বাণিজ্য হয়নি। মহারাষ্ট্র থিয়েটারও বাণিজ্য করতে পারে না সেইভাবে। নাসিরুদ্দিন, ওম পুরি, অমরেশ পুরী, শ্রীরাম লাগুদের কাস্ট করে ২০০০ টাকার টিকিট করেও সেইভাবে বাণিজ্য হয় না।

একবার নাসির, শাবানাদের সঙ্গে এসব নিয়ে কথা বলেছিলাম। ওরা ব্যর্গম্যানের মত বলেছিলেন, থিয়েটার আমাদের প্রথম প্রেম। থিয়েটার প্রেমিক বা প্রেমিকা। প্রেমিক বা প্রেমিকাকে নিয়ে বাণিজ্য করার নীচতায় আমরা ভুগি না। পেটের দায়ে সিনেমায় অভিনয় করি। থিয়েটার হল প্যাশন।


উৎপল দত্ত-ও সিনেমা থেকে অর্জিত টাকা ঢালতেন থিয়েটারে। রতন থিয়াম, গিরিশ কারনাড, হাবিব তানবীর এমন অনেকে বলেছেন - থিয়েটারকে আলু, পটল, চাল, ডাল বেচার মতো দেখা যায় না। দোকানদারি মনোভাব নিয়ে থিয়েটার হয় না।

আমেরিকা, ইউরোপের শত সহস্র দল আছে যারা মুক্ত মঞ্চে অভিনয় করে শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। ব্রেখট, দারিও ফো, বোয়াল, গ্রতভস্কি, বাদল সরকাররা থিয়েটার নামক পণ্য বেচার সংকল্প নিয়ে গদিঘর খোলেন নি।

থিয়েটারকে কারখানা জাত পণ্য ভাববার অসুস্থ মানসিকতা, বিশ্বের কোন সৎ নাট্যশিল্পী ভাবতে পারেন না। তাদের মত এই, "আলু বেচ, পটল বেচো, বেচো বাখরখানি, বেচোনা বেচোনা বন্ধু তোমার চোখের মনি।"

গোলমালটা হচ্ছে দার্শনিক স্তরে। আমরা জুতো তৈরির কারখানা আর শিল্পকে এক করে ফেলছি কিনা! ঋত্বিক বাবুরা বলতেন, সিনেমা, থিয়েটার বানানো যায় না - সৃষ্টি হয়। আমরা পরিচালকরা আসলে পরিচালক নই, স্রষ্টা। বিশ্বের সমস্ত সৃষ্টিশীল মানুষ এটাই মনে করেন। বউয়ের গয়না, গাড়ি, বাড়ি বানাবার জন্য কেউ সিনেমা, থিয়েটারে আসে না। শিল্পের টানে সৃজন কর্মের দায়ে তারা সৃষ্টির নেশায় ধ্যানস্থ হন।

গোর্কি বলতেন, শিল্পীরা মানব মনের ইঞ্জিনিয়ার। বিকল হওয়া মনকে সুস্থ করে তোলে শিল্পী। এ দায় সামাজিক দায়। বেতনভোগী সৈনিকরা এ দায় পালন করে না। নটী বিনোদিনীর মত ডজন ডজন অভিনেত্রী বাণিজ্যিক থিয়েটারের হাড়িকাঠে বলি হয়ে রচনা করে গেছেন মালিকদের দানবীয় ইতিহাসের করুন অধ্যায়। রূপচাঁদ জহুরী বা বীরকৃষ্ণ দাঁ-দের ইতিহাস রয়েছে উৎপল দত্তর নাটক "টিনের তরোয়াল"- এ। ওরা দম্ভ করে বলে, "আমার হাতের দশ আঙ্গুলের দশটা আংটির যে কোন একটা দিয়ে আপনাদের শিল্প, সাহিত্য, নাটক কিনে ফেলতে পারি।"

ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের মুৎসুদ্দি থিয়েটারের মালিক এক কথায় দীনবন্ধু মিত্র, মাইকেলকে বাতিল করে বঙ্কিমচন্দ্রকে কিনতে আগ্রহী হয়।

এটাই তো মূল প্রশ্ন - কুকুরের মত বকলেস গলায় ঝুলিয়ে মালিকের দাসত্ব করা হবে কিনা ? মালিক মুনাফা ছাড়া কিচ্ছু বোঝেনা। মুনাফার জন্য বেদ-বাইবেল-গীতা-কোরান এমনকি নিজের মা-বোন-বউকে বাজারে দাঁড় করাতে প্রস্তুত



বাংলা থিয়েটারের প্রকৃত যাত্রা শুরু হয় "নীল দর্পণ" নাটক থেকে। জমিদারদের উঠোনে মুজরো করার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে সেদিন পাবলিক থিয়েটারের জন্ম হয়েছিল।

এই প্রসঙ্গে চলচ্চিত্রকার বুনুয়েলের সতর্কবাণী মনে করতে হবে, "পুঁজির আওতায় সিনেমার সাদা পর্দা আর সাদা নেই। ক্যামেরাকে বেশ করে আফিম খাইয়ে রাখা হয়েছে। ফলতো সিনেমার সাদা পর্দায় জীবনের সত্য প্রকাশিত হয় না।"


থিয়েটারের পাটাতনটাও পুঁজির দাসত্ব শুরু করলে মানব সভ্যতা বিপন্ন হবে। ফ্যাসিবাদের দানব গিলে খাবে মানবিক যাবতীয় মূল্যবোধ।

প্রতিবেদন : সুব্রত কাঞ্জিলাল

Credit
Photo : Google

For the all News Update Please follow our Website www.tollybangla.com
Subscribe our Youtube Channel Tolly Bangla Youtube
Follow Us on Twitter Tolly Bangla twitter
Like our Facebook Page Tolly Bangla Facebook Page


( প্রিয় পাঠক / পাঠিকা , পোস্টটিতে  লাইক, মন্তব্য ও শেয়ার করুন এবং নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের পেজে লাইক করুন )

No comments

Powered by Blogger.