Header Ads

ভূত নাকি ভাইরাস নাটক - Subrata Kanjilal Natok - Vut Naki Virus


এই সময়ের নাটক
ভূত নাকি ভাইরাস
সুব্রত কাঞ্জিলাল


 নাটক - ভূত নাকি ভাইরাস 

[ নাট্যকার বিমল মুখার্জির বাড়ি।
এই নাটকে মঞ্চসজ্জার কোন প্রয়োজন নেই। চারপাশে কালো কাপড় দিয়ে ঢেকে দিতে হবে। যেন একটা অন্ধকার সময়ের ভাব তৈরি হয়। কয়েকটা কালো ব্লক এদিক-ওদিক ছড়িয়ে থাকবে। আলোর বিন্যাস ও টোনে হালকা গাড়ো নীল রং ব্যবহার করতে হবে। ]

[ বিমল বাবু ৬০ বা ৬২-র কাছাকাছি। সাদা পাজামা সঙ্গে মেরুন রঙের পাঞ্জাবি পরনেএক মাথা মুখ বড় বড় কাঁচাপাকা চুল দাড়ি ও চোখে পুরু লেন্সের চশমা। পর্দা সরে গেলে দেখব গভীর মঞ্চে বসে চুরুট খাচ্ছেন তিনি। ক্যানভাসে তিনি কিছু একটা আঁকবার চেষ্টা করছেন। মুখের চুরুট জ্বলছে। কল-কল করে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। পায়চারি করছেন। উঠছেন - বসছেন। নেপথ্যে মধ্যরাত্রির আবহাওয়া চলছে। খানিক বাদে ও স্ত্রী মা বেরিয়া আসবে বেডরুম থেকে। ]



উমা    ।।     তুমি এখনও ঘুমাতে গেলে না ?
বিমল   ।।     তোমার ঘুমের ব্যাঘাত হলো কি ?
উমা    ।।     বাজে স্বপ্ন দেখে উঠে পড়লাম  -
বিমল   ।।     কফি চলবে ?
উমা    ।।     না-আমার পেট গরম হয় !
বিমল   ।।     তাহলে চা ? বলতো বানাতে পারি -
উমা    ।।     এতরাত্রে ওসব খাওয়ার অভ্যাস নেই।


বিমল   ।।     তাহলে জল খাওতবে ফ্রিজের জল খেও না।
              (উমা বোতল থেকে জল খেয়ে দূরত্ব বজায় রেখে বসবে)
বিমল   ।।     ভয়ের স্বপ্ন নিশ্চয় ? ঘরে ঘরে তোমার মতন সবাই দেখছে। দিনে দেখছে রাতে দেখছে। এক্কেবারে অজানা-অচেনা ভূতের ভয়।
উমা    ।।     ভুতের আবার চেনা-অজানা হয় নাকি !


বিমল   ।।     কেন হবেনা। জন্মের পর থেকে আমরা ভূতের সঙ্গে পরিচিত হই। প্রথম পরিচয়ের ধাক্কা সামলে                  অজানা অচেনা ভূত চেনা চেনা হয়ে যায়। ভয় খানিকটা নরম হয়ে আসে। তারপর জীবনের ঘাটে ঘাটে আরো নতুন নতুন ভুতের দেখা মিলতে থাকে।
উমা    ।।     ভূতের স্বপ্ন আমি দেখিনি।
বিমল   ।।     তাহলে ভয় পেলে কেন ?
উমা    ।।     ভূত ছাড়া মানুষ কি অন্য কিছুতে ভয় পায় না ?




বিমল   ।।     নিশ্চয়ই পায়। মৃত্যু ভয়। বিপদে পড়বার ভয়। বদনামের ভয়। আরো নানা রকম আছে। তোমার তো এই বয়সে এসব ভয় থাকবার কথা নয়। তবে হ্যাঁ মৃত্যুভয় কমন। মানুষের সহজাত।
উমা    ।।     রাত জেগে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে কি আকছো ? আলোটা জ্বালাতে পারো তো -
বিমল   ।।     তা পারি। ঘরের সবকটা আলো জ্বালিয়ে দিনের আলো করে দিতে পারি। তাহলেতো তিনি আসবেন না -
উমা    ।।     কে আসবে না ?
বিমল   ।।     যার ছবি আঁকার চেষ্টা করছি।


উমা    ।।     কার ছবি?
বিমল   ।।     তার নাম শুনলে তুমি আবার ভয় পাবে না তো ? (হাসি) ভয় গো ভয়ের ছবি আঁকছি মানে চেষ্টা                 করছি !
উমা    ।।     নাটক না লিখে এসব আবার কি হচ্ছে ?
বিমল   ।।     কয়েকটা নাটকের অর্ডার রয়েছে।তবে বুঝতে পারছিনা সেগুলি লেখা হয়ে উঠবে কিনা। লেখা                 যদি হয়ে ওঠে সেগুলো কোনদিন বা কবে মঞ্চস্থ হবে। তাই এই নতুন প্রচেষ্টা।
উমা    ।।     সারাটা জীবন পাগলামি করে কাটালে। বয়স হয়েছে। চারদিকের অবস্থা দেখে একটু সাবধানে থাকতে পারেনা ? তোমার মেয়ে রোজ ফোন করে বলে জানতে চায় তোমার কথা ! ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করো কিনা ঘুমাও কিনা !


বিমল   ।।      তুমি তো সারা জীবন ধরে কত সাবধানে জীবন কাটালে তবুও স্বস্তি পাওনা কেন? নির্বিকল্প শান্তি                 পাও না কেন ? ভয় ভয় থাকো কেন ?
মা    ।।     মানুষের জীবনটা তো অশান্তির আতঙ্কের অন্ধকারে ঘেরা।
বিমাল   ।।     ঠিক। একদম ঠিক। গৌতম বুদ্ধেরও একই মত। দুঃখময় পৃথিবী। অনন্ত সুখ বলে কিছু হয়না। মৃত্যুর হাহাকার, অসাম্যের হাহাকার, ক্ষুধার হাহাকার এসব নিয়েই সংসার। তাইতো বলি দুঃখের মধ্যে বসত করে দুঃখকে ভয় কেন ? আগুনের মাঝখানে এসে দাঁড়ালে আগুন কি পোড়াতে পারে ? অতএব নিশ্চিন্তে ঘুমোতে যাও।
মা    ।।     তুমি ?
বিমল   ।।     আমাকে এখন ক্যানভাসে ভয়ের মুখ আঁকতে হবে।
উমা    ।।     দিনের বেলা করলে হয় না ?
বিমল   ।।     রাতেই তার সঙ্গে মুখোমুখি হতে হয়। দিনে দেখা করেন না তিনি। দিনের আলো তিনি এড়িয়ে                   চলেন। দরকার হলে একটা ঘুমের পিল খেয়ে শুয়ে পড়ো।


                (উমা বিরক্ত হয়ে চলে যাবে। ফোন রিং হবে।)


বিমল   ।।     এত রাতে আবার কে -
              (মঞ্চের অন্য অংশে এক তরুণের মুখ দেখা যাবে।)
দেবা    ।।     দাদা আমি দেবাশিষ বলছি।
বিমল   ।।     কোন দেবাশিষ ? আমি ১২-১৪ জন দেবাশিষকে জানি -
দেবা    ।।     আমি নৈহাটি দেবা বসু। সারণী আমাদের দল।
বিমল   ।।     - নৈহাটি সারণি! এত রাতে জেগে কেন ? তোমরাও কি ভূতের ভয় ঘুমোতে পারো না ?
দেবা    ।।     নানা দুশ্চিন্তায় ঘুম আসেনা। অলস জীবন একটা রেড সিগন্যালের সামনে গভীর জঙ্গলের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়েছি।
বিমল   ।।     তাহলে ট্রেন থেকে নেমে পড়ো।


দেবা    ।।     সাহস নেই। ট্রেনের সব যাত্রী দরজা-জানলা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়েছে।
বিমল   ।।     আমাকে মনে পড়লো কেন?
দেবা    ।।     শরীর ভালো আছে তো? অনেকদিন খবর পাইনা! চারিদিকে যা চলছে-
বিমল   ।।     অজানা ভুতের ভয়। আমার ওসব নেই। তাই শরীর ব্রেকডাউন করে না।
দেবা    ।।     আমাদের দলের অভিনেত্রী সুতপাকে আপনি তো চেনেন ? ওরও ভূতের ভয় ছিল না ! মা হতে চেয়েছিল ! মা হতে গেলে সাহস ধৈর্য স্বপ্ন আরো অনেক কিছু দরকার হয়। সুতপার সেসব ছিল। তবে কাল সব তছনছ হয়ে গেছে।
বিমল   ।।     কাল কি হয়েছে?
দেবা    ।।     প্রসব যন্ত্রণা উঠেছিল।ওর বাড়ির লোকেরা অনেক চেষ্টা করে একটা গাড়ি জোগাড় করে                 হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিল ওকে। হাসপাতালে ওদের ঢুকতে দেয়নি। ফিরে আসবার সময় গাড়িটাকে পুলিশ ধরে। থানায় নিয়ে যায়। সেখানে সুতপা একটা মরা সন্তান প্রসব করেছে।


বিমল   ।।     বল কি !
দেবা    ।।      লকডাউন ভাঙ্গার কারণে ওদের নামে F.I.R হয়েছে।
বিমল   ।।     এসব কি চলছে ! সবাই কি উন্মাদ হয়ে গেছে ! সাধারণ বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পেয়েছে !
দেবা    ।।     তবে ওরা বাড়ি ফিরে এসেছে। সম্ভবত সুতপা মানসিক ভারসাম্য হারাতে বসেছে।
বিমল   ।।     না - না - হয় না - হতে পারে না। ওকে বোঝাতে হবে। নতুন স্বপ্ন দেখাতে হবে।
                জীবন থেমে থাকে না। আমি ওদের বাড়ি যাবো।
দেবা    ।।     আপনাকে ওরা বাড়িতে ঢুকতে দেবে না।
বিমল   ।।     কেন ?
দেবা    ।।     ওরা এখন ভূতের ভয় কোমায় চলে গেছে।
বিমল   ।।     তাহলে তো আমাদের অবশ্যই যাওয়া দরকার।




দেবা    ।।     পরশু থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে বসে আছে। আমরা কয়েকজন নাটকের দলের ছেলেরা ওখানে গিয়েছিলাম। ডাকাডাকি করেছিলাম। দরজা খোলে নি।
বিমল   ।।     হ্যাঁ। গোটা দেশ দরজা বন্ধ করে বসে আছেবাইরে পুলিশ হুমকি দিচ্ছে। ঘরের বাইরে বেরোলে অ্যারেস্ট করতে বাধ্য হবে।
দেবা    ।।     আমাদের দলে সুতপা ছিল একমাত্র মহিলা শিল্পী। ওকে কেন্দ্র করে আমরা নাটক লিখতে বলতাম। অনেক নাটক সুতপা একা টেনে নিয়ে গেছে। কত পুরস্কার কত কল শো---কিছু ভালো লাগছে না! দলটা বোধায় উঠে যাবে!
বিমল   ।।     অত ভেঙে পড়ছো কেন ? দলউঠে যাবে কেন ? এর চেয়ে অনেক বেশি ঝড় তোমাদের মতো দলগুলোর মাথার উপর দিয়ে বয়ে যায় !
দেবা    ।।     এই ঝড়টা যে মানুষের মন গুলোকে ভেঙে দিচ্ছে। দিনের পর দিন ঘরে বন্দী হয়ে থেকে শরীরটাকেও তালগোল পাকিয়ে দিচ্ছে। আঘাত এসেছে মস্তিষ্কে।


বিমল   ।।     অস্বীকার করছি না। তবুও বলছি - উঠে দাঁড়াতে হবে ! ভুতের চরিত্র আবিষ্কার করতে হবে!                 আমি ক্যানভাস নিয়ে বসেছি ভুতের চেহারাটা আঁকবো বলে !

[ আবহাওয়াসংগীতের মধ্যে বিমলের আরো অনেক কথা হারিয়ে যাবে! দেবাশীষের আলোটা নিভে যাবে
বিমল যখন বুঝতে পারবে ফোনের বিপরীতে দেবা আর নেই তখন সে কয়েকবার রিং করে ধরবার চেষ্টা করবে। দেবা উত্তর দেবেনা। বিমল দুশ্চিন্তায় পায়চারি করবে। ক্যানভাস টা তুলে নেবে আকবারচেষ্টা করবে। কিছুতেই ভুতের মুখটা ধরতে না পেরে ছটফট করবে। উমা আবার বেরিয়ে আসবে। ]

উমা    ।।     এই শুনছো দেখো তোমার মেয়ে ফোন করেছে - (নিজের ফোনটা স্বামীর দিকে এগিয়ে দিয়ে আবার ঘুরিয়ে আনে! তারপর মেয়েকে ফোন করে) সুমি - মা বলছি - তোর বাবার ফোনে কথা বল -
                (কিছুক্ষণ পর বিমলের ফোন রিং হবে)


বিমল   ।।     কে সুমি নাকি হ্যাঁ বলছি - কি বললি - অমলকে পাওয়া যাচ্ছে না ?
সুমি     ।।     হ্যাঁ বাবা। ছোট কাকার ছেলে বুবু আমাকে ফোন করেছিল। গত সপ্তাহে দুর্গাপুরে বুবুর বাড়িতে                 ছোট কাকার যাওয়ার কথা ছিল। ছোট কাকা যায়নি।
বিমল   ।।     অমল তো খড়গপুরে থাকে ওর বড় মেয়ে লতিকার বাড়িতে।
সুমি     ।।     বুবু লতিকা দিদির বাড়িতে ফোন করেছিলে। কেউ ফোন ধরেনি।


বিমল   ।।     ফোন ধরেনি বলে তোর ছোট কাকা যে খড়্গপুরে নেই এটা ভাবা হচ্ছে কেন ?


সুমি     ।।     দিন পাঁচেক আগে  কাকা বুবুকে ফোন করে বলেছিল যে বুবুর বাড়িতে যাবে বলে কাকা নাকি                 বাড়ি থেকে বেরিয়েছে। ঐদিন লতিকাদিও বুবুকে ফোন করে বলেছিল যে, বুবু যেন ছোট                 কাকাকে বেশিদিন না আটকে রাখে।
বিমল   ।।     আহা এমন তো হতে পারে যে তোর ছোট কাকা খড়গপুর থেকে বেরিয়ে দুর্গাপুরে না গিয়ে বাড়িতে ফিরে এসেছে। কিংবা অন্য কোন কারণে অন্য কারো বাড়িতে চলে গেছে।
সুমি     ।।     ছোট কাকার ফোন বন্ধ। রিং হচ্ছে না। গত চারদিন ধরে খড়্গপুরের লতিকাদিকে ফোন করেও রেসপন্স হচ্ছে না।
বিমল   ।।     তোর ছোট কাকা যেখানে যেখানে যেতে পারে সেসব জায়গায় ফোন করা হয়েছে কি ?
সুমি     ।।     বুবু বলল অনেককে ফোন করা হয়েছে তারা সবাই বলছে ছোট কাকা তাদের কাছে যায়নি। সবচেয়ে বড় কথা লতিকাদি ফোন বন্ধ করে রেখেছে কেন ?
বিমল   ।।     লতিকার স্বামী সুপ্রকাশ তাকে কি ফোন করা হয়েছে ?
সুমি     ।।     সুপ্রকাশ রায় খড়্গপুরের নেই। জামাইবাবু নাকি অফিসের কাজে ব্যাঙ্গালোরে গিয়ে আটকে পড়েছে।


বিমল   ।।     বলিস কি। লতিকা তাহলে খড়্গপুরের একা থাকে! ওর ছেলে মেয়ে তো কেউ নেই !
সুমি     ।।     বাবা তোমার চেনা যানা আত্মীয়দের বাড়িতে ফোন করে দেখতো যে, ছোট কাকা সেসব জায়গায় গিয়েছে কিনা। বুবু খুব দুশ্চিন্তায় আছে !
বিমল   ।।     তা না হয় করছি। কিন্তু অমল যাবে কোথায় ! এই বয়সে এরকম বোকার মত কাজ করবে
                কেন ? ও কি বুঝতে পারছে না যে, ওর জন্য সবাই দুশ্চিন্তা করছে !
সুমি     ।।     আমার মনে হয় ছোট কাকা কোথাও গিয়ে আটকে পড়েছে। হয়তো বিপদে রয়েছে।
বিমল   ।।     ঠিক আছে আমি কয়েকজনকে ফোন করছি। খোঁজ-খবর পেলে তোকে জানাবো।
               (বিমল দুশ্চিন্তা পায়চারি করতে থাকে।)
উমা    ।।     তোমার ছোট ভাই তো কখনো এরকম কান্ড করে না। যথেষ্ট রেস্পনসবল। বউ মারা যাবার পর                 ঠাকুরপো যেভাবে তার ছেলেমেয়েদের আগলে রেখেছে - প্রত্যেক মাসে অমল ঠাকুরপো কিছুদিনের জন্য দুর্গাপুরে থাকে আবার খড়্গপুরে ফিরে আসে !
বিমল   ।।     সেটাই তো ভাবছি উমা। সময়টা মোটেই ভালো না। ট্রেন চলছে না বাস চলছে না। দেশটা শ্মশানে শূন্যতা নিয়ে রাত জাগে। এই অবস্থায় কোথায় খুঁজতে যাবো তাকে !
উমা    ।।     থানায় খোঁজ করলে হয় না ?
বিমল   ।।     ওদের এখন চান-খাওয়া ভুলে ভূতের পেছনে ছুটতে হয়। ওরা কিছুই করবে না। স্বাভাবিক সময়                 ওদের নাড়ানো যায় না। মুখের উপর বলে দেবে - বুড়োদের মিসিং ডায়েরি হয়না ! কিংবা বলবে মর্গে খোঁজ করুন !

উমা    ।।     যা ভাল হয় করো। আমি শুতে চললাম।
বিমল   ।।     হ্যাঁ তাই যাও। ভাই তো আমার। তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো কোন প্রয়োজন নেই।



[ উমা ঘরে চলে যাবে শুতে। বিমল বাবু পায়চারি করেন। তারপর আবার ক্যানভাস নিয়ে নাড়াচাড়া করবেন। এই সময় আবার ফোন আসবে। ]

বিমল   ।।     হ্যাঁ বলছি - কে ? বুঝতে পারছি না - কথা পরিষ্কার হচ্ছে না - ঘরের বাইরে এসে বলুন -
সুবীর   ।।     ঘরের বাইরে তো রয়েছি। বাড়ির ঝুল বারান্দায় পায়চারি করছি। আমি সুবির ঘটক। এবার চিনতে পেরেছেন ?
বিমল   ।।     এত রাতে কি ব্যাপার ? ঘুমাননি ?
সুবীর   ।।     কি করে ঘুমাই গিন্নির হাত ধোয়া এখনো চলছে -
বিমল   ।।     হাত ধোয়া মানে !
সুবীর   ।।     এই দেখো হাত ধোয়া বোঝেন না! আমার গিন্নী আগে পা ধোয়া বাতিক ছিল। যতবার বাথরুমে যাবে, ততবার এক বালতি জল ঢালতে হত। রান্না করার আগে একবার, স্নান শেষ হলে একবার স্নান। তারপর ধরুন বাড়ির বাইরে বেরোতে গেলে একবার গা ধোয়া, ফিরে এসে আর একবার। জলের পোকা যাকে বলে। এসব বেশি বয়সে ছুচিবাই ভাবতাম। কিন্তু বিয়ের পর থেকে এসব দেখে আসছি। এখন হয়েছে হাত ধোয়া।
বিমল   ।।     এত রাতে খাওয়া-দাওয়া করলেন বুঝি ?
সুবীর   ।।     নানা দশটার মধ্যে ও পাট চুকে যায়। এতক্ষন উনি টিভির সামনে বসে ছিলেন। খবর শুনছিলেন                 ভাইরাসের খবর। যতবার খবরের মাঝখানে বিজ্ঞাপন বিরতি চলতে থাকে ততবার গিন্নি সাবান দিয়ে হাত ধুতে চলে যায়। এখন টিভি অফ করে বাথরুমে গেছে রাতের মতো শেষবারের হাত ধুতে।


বিমল   ।।     হাজা হয়ে যাবে তো -
সুবীর   ।।     হয়েছে তো। পায়ের মতো হাতের আঙুলের ফাঁকে ফাঁকে শ্বেতির দাগের মতো কি সব হয়েছে -
বিমল   ।।     ডাক্তার দেখান।
সুবীর   ।।     পাড়ার ডাক্তার গুলো পালাতক। কেউ ডিস্পেন্সারিতে বসেছে না। আমাদের পাড়ার একটা মেয়ে                 প্রসব যন্ত্রনায় ছটফট করতে করতে হাসপাতালে গিয়েছিল। ভর্তি না নিয়ে ফেরত দিয়েছে।                 বাড়িতে ফেরবার পথে মেয়েটার মড়া বাচ্চা হয়েছে। আজ বিকেলে গিন্নি বলছিল আমার সঙ্গে                 নাকি এক বিছানায় শোবে না ! সোশ্যাল ডিস্ট্যান্স মেন্টেন করতে চায় !
               আজ সকালে বাজারে গিয়েছিলাম আলু পটল কিনব বলে। মুদি দোকানের সামনে গোল-গোল খড়ির গণ্ডি। সেই একটা গন্ডিতে এক ঠাকুমা দাঁড়িয়ে তার নাতি কে বলছে - ওবাবা পুটু ওদিকে যাসনি গন্ডির মধ্যে চলে আয় ! না হলে ভাইরাসে খাবে ! (হাসি) বুড়ি ভেবেছে গোল গোল ঘড়ির গণ্ডির মধ্যে ভাইরাস নেই ! গন্ডির বাইরে ভাইরাসের বাঘ ঘুরে বেড়াচ্ছে! আমাদের পাশের বাড়ির ঘোশাল বাবু বাজার করতে যান রেনকোট গায়ে দিয়ে ! ফিরে এসে বাইরে রাখা ডেটল জলে নিজেই চুবনি খান হাতের বাজার টাকেও চুবুনি দেন !


               আপনি ভালো আছেন তো বিমল বাবু ? আপনার গিন্নি হাত ধোয় তো ? এক বিছানায় আছেন নাকি আলাদা হয়েছেন ? (হাসি) প্রফেস্যার সেনকে তো আপনি চেনেন ! তিনি তো গত ১৫ দিন নিজের ঘরে দরজা দিয়ে বসে আছেন ! এটাচ বাথরুম বলে রক্ষা ! জানলা দিয়ে তাকে খাবার দিতে হয় ! এত রাতে আপনার ঘুম ভাঙিয়ে বিরক্ত করলাম কিছু মনে করবেন না ! দিন আর কাটতে চায়না ! মুসৌরি যাওয়ার টিকিট কাটা ছিল ! ক্যানসেল করে ঘরে বসে আছি ! পাহাড়ের মানুষগুলো কি করছে জানতে ইচ্ছে করে ! ওরাও কি ঘরবন্দি ! কাল থেকে ভাবছি এখানে আর থাকব না ! লোটা কম্বল নিয়ে হিমালয় চলে যাব ! ওখানে মুক্ত বাতাস ! ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া মুক্ত মানুষের মধ্যে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দেবো ! রাখলাম বিমলবাবু !

                                                          ৭

[ বিমলবাবু গভীর নিঃশ্বাস নিলেন। হাতের মোবাইলের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মোবাইলের মধ্যে সুবীর ঘটককে যেন দেখতে পান। মোবাইলটা আবার বেজে ওঠে ]

সুবীর   ।।     গতকাল ফেসবুকে একটা পোস্ট দেখলাম। আপনি তো জানেন আমি রাজনীতির লোক নই। ওসব বুঝিনি কখনভোট দিতে যানি কখন। ৩৫ টা বছর ছাত্র পড়িয়েছি। ফেসবুকের পোস্টটা আমাকে অগাধ জলে ফেলে দিল। চাকরি বাকরি না পেয়ে যেসব ছেলেছোকরারা অন্য প্রদেশে কাজ খুঁজতে গিয়েছিল তাদের একটা বড় দল দিল্লি থেকে ফিরছিল কলকাতা। উত্তরপ্রদেশের কোন একটা জায়গায় হাই রোডের উপর তাদেরকে দাঁড় করিয়ে ওখানকার পুলিশ ওদের শরীরে জীবাণুনাশক স্প্রে করে দেয। মানুষগুলোর তখন যন্ত্রণায় গড়াগড়ি খাচ্ছি রাস্তার       উপর। আচ্ছা এমনটা কেন হয় ? ওদের জন্য বাড়ি ফেরার গাড়ি থাকে না কেন? কেউ ডেকে একটু খাবার দেয় না ? জল দেয় না ? ওরাদেশের নাগরিক তো ? বিমলদা - বিমলদা প্লিজ ফোনটা কেটে দেবেন না ! আজ আর কেউ কারো কথা শুনতে চায় না ! রাতদুপুরে তাই আপনাকে বিরক্ত করছি ! মাথার মধ্যে অসম্ভব যন্ত্রণা ! ঘুমোতে পারছিনা ! কি যে হচ্ছে চারদিকে কিছুই বুঝতে পারছিনা ! আমার ফোনে বেশ কয়েকজন সাইকিয়াট্রিস্ট মেসেজ    


                পাঠিয়েছে ! ওরা বলছিল আমি কি ট্রমাতে ভুগতে শুরু করেছে ? মানসিক ভারসাম্য চলে গেছে ?তাহলে যেন ওদের সঙ্গে দেখা করি ! আপনি বিশ্বাস করুন আমি আমি এখনও ভাবতে পারি ! এখন আমার খিদে পায় ! এখনো আমার মধ্যে মন নামে একটা বস্তু আছে ! অন্যের ব্যথা-যন্ত্রণা দেখলে আমার মন খারাপ হয়ে যায় ! তবে এসব আর কতদিন থাকবে আমি জানিনা !
                                                      
                                                         ৮

[ সুবির বাবুর ফোনটা অফ হয়ে যাব। সম্ভবত ফোনের চার্জ চলে গেছে অনেক পরে সুবীরবাবু সেটা বুঝতে পারবেন। তারপর হতাশায় ভেঙে পড়বে। বিমলবাবু ফোন কেটে যাওয়াতে আবার দুশ্চিন্তা ডুবতে থাকবেন। ]



বিমল   ।।     যে ছবিটা আঁকতে চাই সেটা বোধহয় একটু একটু করে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। আচ্ছা আমি তো পেশাদার নাট্যকার। ডাক পেলে কখনো কখনো সিনেমার জন্য গল্প চিত্রনাট্য লিখি। ছবি আঁকাটাতো সেকেন্ডারি ব্যাপার। তাহলে একটা নাটক না লিখে ক্যানভাসে রং করার জন্য ছটফট করছি কেন ! গত ক'দিন ধরে কয়েকটা দলের ডিরেক্টররা নাটক চেয়ে ফোন করেছে ! রোজ তাগাদা দিচ্ছে। এইরকম কঠিন সময় শেক্সপিয়ার নাকি একটা গুরুত্বপূর্ণ নাটক লিখে ফেলেছিলেনতাহলে আমি কেন পারছি না। (ফোন রিং) বলছি হ্যাঁ বিমল মুখার্জি - হ্যাঁ জেগে বসে আছি ! কি করছি ? পায়চারি করছি ! ছবি আঁকার ব্যর্থ চেষ্টাও চলছে ! কি বললে নাটক  লিখছি না কেন ? কে করবে ? আর কেইবা দেখতে আসবে ? এখনতো সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখবার সময় এসে পড়েছে ! সামাজিক এবং শারীরিক দূরত্ব ! থিয়েটার দূরত্ব ঘুচাবার চেষ্টা করে ! মানুষেমানুষে মিলনের কথা বলে ! কি বললে একক অভিনয় ? একক অভিনয় কার জন্য ? একক দশক এর জন্য ? ভাবো সবকিছু নতুন করে ভাবো। আমি তো দেখতে পাচ্ছি মগজে মগজে কার্ফু জারি হয়েছে। ভূতের ভয়ে কেউ তোমার অভিনয় দেখতে আসবেনা। যদি বা কেউ কেউ আসে তাকে তুমি তোমার কথা শোনাতে পারবে না। ও হ্যাঁ ফোনটা করে ভালোই  করেছ তুমি কি আমার ছোট ভাইকে তোমাদের ওদিকে যেতে দেখেছো ? কি বললে দেখনি ! হ্যাঁ হ্যাঁ বল - হাসপাতালের দিকে গিয়েছিল ? তারপর ? তারপর কি হল ? অ্যাম্বুলেন্স ফিরিয়ে দিয়েছে ? হাসপাতালে অ্যালাও করেনি ? এসব তুমি কি করে জানলে ? তোমার বোন ওই হাসপাতালে নার্স ! সে বলেছে ? হ্যাঁ বল অবস্থা ভাল ছিল না ? অক্সিজেন দেওয়ার প্রয়োজন ছিল ? তবু হাসপাতালে এডমিট করিনি ! তারপর কি হল বল তারপর কি হল? ওরা এম্বুলেন্স নিয়ে কোথায় গেল? কি বললে সম্ভবত অন্য কোন হাসপাতালে ? হ্যাঁ - হ্যাঁ আমার ভাইয়ের মেয়ে তাকে তোমার বোন চেনে ! একসঙ্গে কলেজে পড়াশোনা করেছে ! আমার ভাইয়ের মেয়েকে তোমার বোন ফোন করে জানতে চেয়েছিল যে, অন্য কোন হাসপাতালে ভর্তি হতে পেরেছে কিনা ! কি বললে ? পারেনি ! বাড়ি ফিরে গেছে তারপর তারপর কি হয়েছে তোমার বোন তারপর আর ফোন করেনি কি বললে ফোন করেছিল রেসপন্স পাওয়া যায়নি !


[ বার ফোন কেটে যায় ! বিমল অনবরত হ্যালো হ্যালো করতে থাকবে ! তারপর হতাশায় ভেঙে পড়বে! ঘরের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসবে উমা। ]

উমা    ।।     শুনছো - তোমার মেয়ে ফোন করেছে - ঠাকুরপোকে - না কি পাওয়া গেছে -
বিমল   ।।     সত্যি বলছো ? কোথায় ছিল ?
উমা    ।।     খড়গপুরে ওর মেয়ের বাড়িতে।
বিমল   ।।     সেকি ! বাড়িতে ছিল অথচ বাইরে থেকে কেউ ওদের ফোনে পাচ্ছিলনা ! সুমি কিভাবে জানলো ?
উমা    ।।     তুমি মেয়ের সঙ্গে কথা বল - (মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলবে) সুমি তুই তোর বাবাকে সব কথা   বল - কি হয়েছিল কি ভাবে ওদের খবর পাওয়া গেল - আর শোন তুই তোর বাবার ফোনে কথা বল - নানা আমার ফোন আমি কাউকে ধরতে দিচ্ছি না - বলছি তো আমরা এখন দূরত্ব মেনটেন করছি !


সুমি     ।।      (ফোনে কথা বলবে) বাবা শোনো আমি বলছি -
বিমল    ।।     হ্যাঁ বল কি হয়েছিল ?
সুমি     ।।     লতিকাদি কাকাকে নিয়ে কয়েকদিন আগে হাসপাতালে বেরিয়েছিল। কাকার বুকে ব্যথা উঠেছিল। ওদের পাড়ায় যেসব ডাক্তার বসে বিভিন্ন চেম্বারে, তাদের কাউকে কল করে পায়নি। তখন একটা এম্বুলেন্স বার করে কলকাতায় চলে এসেছিল। কিন্তু কলকাতায় কোন হাসপাতালেই কাকাকে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। কয়েকটা নামি-দামি নার্সিংহোমে ওরা গিয়েছিল। কিন্তু কেউ ভর্তি নেয়নি। সামান্য চিকিৎসা পর্যন্ত হয়নি।
বিমল   ।।      হ্যাঁ ওসব কথা শুনেছি। আমার পরিচিত এক নাট্যকর্মীর কাছে। তারপর কি হলো ?
সুমি     ।।     ওরা বাড়িতে ফিরে যায়। ওদের পাড়ার ছেলেরা কয়েকজন কিভাবে যেন একজন ডাক্তারকে ধরে এনেছিল। অক্সিজেনও জোগাড় করেছিল। তারপর ওদের পাড়ায় পুলিশ পোস্টিং হয়। কেউ কারোর বাড়িতে যেতে পারছিল না। খবরা-খবর করতে পারছিল না।
বিমল   ।।     তারপর - তারপর কি হল বল - কি হল চুপ করে আছিস কেন ? বল কি হলো ?
সুমি     ।।     এইমাত্র খবর পেলাম যে মানে ওদের পাড়ার একটা ছেলে - লতিকাদির মোবাইল থেকে আমার নম্বর পেয়ে আমাকে ফোন করে জানায় যে -
বিমল   ।।     অমল ভালো আছে ?
সুমি     ।।     আজ বিকেলে ওদের বাড়িতে পুলিশ এসেছিল -

১০

বিমল    ।।     পুলিশ - পুলিশ কেন ?
সুমি     ।।     কিসের জন্য বলতে পারবোনা। পুলিশ ওদের বাড়ি দরজা ভেঙে ঢুকে ছিল।
বিমল   ।।     কি বলছিস তুই!
সুমি    ।।     লতিকা নাকি ছোট কাকার মৃতদেহ নিয়ে তিনদিন তিনরাত ঘরের হচ্ছে বসেছিল।
বিমান   ।।     মৃতদেহ - অমলের ডেড বডি ! তিনদিন তিনরাত ঘরের মধ্যে নিয়ে বসে ছিল ! কিন্তু কেন ?
সুমি     ।।     ভয় ! আতঙ্ক ! বাবাকে বাঁচাতে না পারার লজ্জা ! অভিমান !
বিমল   ।।     লতিকা কেন ঘরের বাইরে এসে চিৎকার করে বলবার চেষ্টা করলো না যে - আমার বাবাকে তোমরা কেন বাঁচতে দিলেনা ? কি দোষ করেছি আমি ? কি দোষ করেছে আমার বাবা?খড়গপুর থেকে কলকাতা ছুটে গিয়েও কোন হাসপাতালে কেন আমার বাবাকে কেউ চিকিৎসা করল না ? কিসের আতঙ্ক ? কিসের ভাইরাস ?
সুমি     ।।     বাবা - বাবা - যে ছেলেটা আমাকে ফোন করেছিল - এতসব কথা জানিয়েছিল - তার মুখে শুনলাম - বাবাকে বাঁচাতে না পেরে লতিকাদি নিজেও যে বোবা হয়ে গেছে ! শূন্য দৃষ্টি আকাশের দিকে ছুঁড়ে দিয়ে পাথরের মত বসে আছে ! তার মুখ থেকে কেউ একটা কথা শুনতে পাচ্ছেনা !
বিমল   ।।     এ কোন অন্ধকার সময়ের গর্ভে ঢুকে যাচ্ছি আমরা ?



[ অন্ধকার ক্রমশ আরও গাঢ় হতে থাকে। এলোমেলো ঝড় ওঠে। বিমল বাবুর চারপাশের বস্তুগুলো উড়তে থাকে। ঝড়ের তাণ্ডবে তিনি নিজেকে সামলাতে পারেন না। বারবার পড়ে যা ন। অনেক চেষ্টা করে দাঁড়াবার জন্য অবলম্বন খোঁজেন। ঠিক এই সময় এক ছায়ামূর্তি হাত বাড়িয়ে দেবে। বিমল তার হাত ধরে উঠে দাঁড়াবে। ]

ছায়ামূর্তি ।। পড়ে গিয়ে চোট পেয়েছো নিশ্চয়ই ?
বিমল    ।। তা একটু।
       ( বিমল এবার খোঁড়াতে খোঁড়াতে হাঁটার চেষ্টা করে। চারপাশের লণ্ডভণ্ড অবস্থা দেখে হতাশ হয়ে পড়েন।   কিছু জানো খুঁজতে থাকে। )

ছায়া    ।। কি খুঁজছেন?
বিমল   ।। আমার রং তুলি ইজেল ক্যানভাস--
ছায়া    ।। ওই তো ওইদিকে ঝড়ের তাণ্ডবে লুটোপুটি খাচ্ছে-
বিমল   ।। আমি এখন কোথায়?
ছায়া    ।। আপনার বাড়িতে না। ঝড়ের তাণ্ডবে আপনাকে অনেকটা দূরে ওড়িয়ে এনে ছে। আজ সূর্য ওঠেনি।            আকাশে কৃষ্ণবর্ণ কঠিন মেঘ। সূর্য ওঠার কোন ঠিক ঠিকানা নেই।

১১

বিমল   ।। এখন রাত না দিন?
ছায়া    ।। রাত-দিনের পার্থক্য ঘুচে গেছে।
বিমল   ।। আমি কি কোনো ফাঁকা মাঠে মধ্যে দাঁড়িয়ে আছি ?
ছায়া    ।। এটা জেলখানার মাঠ ও ভাবতে পারেন। আবার ফুটবল গ্রাউন্ড কিংবা ঘরের মাঠে ওভাবতে পারেন।
বিমল   ।। এটা কি কলকাতা ? বাংলাদেশ ?
ছায়া    ।। দেশ রাজ্য মহাদেশ এর পার্থক্য ঘুচে গেছে। গোটা পৃথিবীটাই এখন এইরকম।
বিমল   ।। আশ্চর্য কথা বল ছেন। আপনি কে বলুন তো?
ছায়া    ।। সেকি আমাকে চিনতে পারছেন না!
বিমল   ।। নাতো-আগে তো কখনো দেখিনি!
ছায়া    ।। কিছুদিন ধরে আপনিতো আমাকে খুঁজছে ন।
বিমল   ।। আপনাকে খুঁজছি মানে? কে আপনি?
ছায়া    ।। আপনি তো আমার মুখ আকবেন বলে তুলি ক্যানভাস নিয়ে বসেছেন।
বিমল   ।। আপনাকে আঁকবো! সেটা আপনি কি করে জানলেন?
ছায়া    ।। জানা যায়। আমি অন্তর্যামী।
বিমল   ।। সেকি ! আপনি ভূত না ভগবান ?
ছায়া    ।। দুটোই। যে যেভাবে আমাকে দেখে।
বিমল   ।। দেখুন আমার মন মেজাজ ভালো নেই। আবোলতাবোল কথা বলার মানসিকতা হারিয়ে ফেলেছি। আমার ছোট ভাই মারা গেছে। তার মৃতদেহ নিয়ে তারই মেয়ে ঘরের মধ্যে বন্দী হয়ে আছে।
ছায়া    ।। জানি। আতঙ্ক নগরীতে আপনার ভাইয়ের মত হাজার হাজার বাড়িতে অসংখ্য মৃতদেহ গৃহবন্দি হয়ে পচনের অপেক্ষায়। আরো অনেক ক্ষুধার্ত মানুষের শরীর লাশ হয়ে যাবার অপেক্ষায় রয়েছে। মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে হাজারে হাজারে কঙ্কালগুলো ঘরের বাইরে আসার জন্য অনবরত দরজায় আঘাত করে চলেছে।
বিমল   ।। আপনি কি তাহলে সন্ত্রাসের দু ত! আতঙ্ক নগরীর মুকুটহীন সম্রাট ?
ছায়া    ।। অনেকটা তাই।
বিমল   ।। আপনি জীবন্ত না মৃত? মানুষ না অন্য কিছু?


ছায়া    ।। ন্তু যন্ত্র মানুষ শ্বাপদ ইত্যাদি সবকিছু মিলিয়ে একটা কম্পাউন্ড মিক্সার আমার এই ইনভিজিবল চেহারাটা। ওরা আমাকে তৈরি করেছে। আমার্ স্রষ্টা ওরা।
বিমল   ।। ওরা-কাদের বলছেন? তারা কারা? কী তাদের পরিচয়? আর কেনই বা আপনাকে এভাবে ওরা তৈরি করেছে?

১২

ছায়া    ।। অনেক মাথা টাটা খাটিয়ে আমাকে তৈরি করেছে। ওদের প্রয়োজন।
বিমল   ।। কিসের প্রয়োজন?
ছায়া    ।। কোরা বিপদে পড়েছে। ভয়ঙ্কর বিপদ। অস্তিত্বের সংকট। ওদের ৩০০ বছরের সাম্রাজ্য বিপন্ন। ওহো ওদের পরিচয়টা এবার দেওয়া দরকার। ওরা হলো কর্পোরেট পুঁজির মালিক। আগে যাদের শ্রেষ্ঠই - সওদাগর-বণিক ব্যবসায়ী বলে সবাই জানতো! আধুনিক রাষ্ট্রের ওরাইতো আসল কর্ণধার! এখন রাজা রানী নেই ! রাজা রানীর রাজ্য পাঠ বদলে গেছে! এখন গণতন্ত্রের যুগ! প্রধানমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খাদ্যমন্ত্রী মন্ত্রী এদের সবাই দেখে ! এরা নাকি জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়! আসলে দেশটা চলে কর্পোরেট পুঁজির সুতোর টানে! মন্ত্রীরা পুতুলনাচের পুতুল !
বিমল   ।। এটা তো - রবীন্দ্রনাথের কথা। রবি ঠাকুরের লেখায় পড়েছি। বলছিলাম যে ওদের বিপদটা কি ?
ছায়া    ।। বাজারের সংকট। প্রচুর উৎপাদন। গোডাউন উপচে পড়েছে। বেচার জায়গা নেই। ১০০ জনের হাতে            দেশের সমস্ত সম্পদ জমা হয়ে পড়ে আছে। ৯০ জনের পেটে ভাত নেই। মাথার উপরে ছাদ নেই। লজ্জা নিবারণের কাপড় নেই। চাল রুটি কেনার পয়সা নেই।
বিমল   ।। দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধ হয়েছিল এই কারণেই। ওরা নিজেদের মধ্যে মারামারি করে ছিল পৃথিবীটা কার অধীনে থাকবে।
ছায়া    ।। ওরকম যুদ্ধ করার এখন আর উপায় নেই। যে কেউ বোতাম টিপে পৃথিবীকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
বিমল   ।। অথচ যুদ্ধ চাই। বাজার দখলের জন্য যুদ্ধ। পৃথিবীটা কার তাবেদারিতে থাকবে।
ছায়া    ।। সেই কারণেই আমাকে তৈরি করা হয়েছে।
বিমল   ।। তুমি কি করে যুদ্ধ করবে? তুমি কি পারমানবিক বোমা?
ছায়া    ।। তার চেয়েও ভয়ঙ্কর। তার চেয়েও ভয়াবহ। বোমা বন্দুক ব্যবহার না করে আমাকে প্রয়োগ করে যুদ্ধ জয় করা যাবে। সামরিক খাতে বিপুল অংক ব্যয় করার প্রয়োজন হবে না।
বিমল   ।। ঠিক বুঝলাম না।
ছায়া    ।। আমাকে ব্যবহার করে যুদ্ধ করাও যাবে বাণিজ্য করাও যায়। মানুষকে বোকা বানিয়ে যেমন রাজনীতির ডিভিডেন্ট তুলতে হয়। এ কিভাবে মানুষকে ভয় দেখানো যায়---নাটকীয় ভাবে আতঙ্কিত করা যায় তাহলে বিপুল বাণিজ্য হতে পারে!
বিমল   ।। কিভাবে ভয় দেখাবে?
ছায়া    ।। মৃত্যু হয়। সব মানুষই নিজেকে ভালোবাসে। কেউ মরতে চায় না। শত বঞ্চনা লাঞ্ছনা সহ্য করেও মানুষ বাঁচার স্বপ্ন দেখে। সেই মানুষকে যদি তুমি ঠিকঠাক চিত্রনাট্য তৈরি করে মৃত্যুভয় দেখাতে পারো তাহলে সেই মানুষ ভেড়ার পালের মত তোমার বশংবদ হয়ে পড়বে। তখন তুমি তাকে যা বলবে সে বিশ্বাস করবে। তুমি যদি তাকে প্রখর রোদ্দুরে সূর্যের দিকে তাকিয়ে এক পায়ে দাঁড়িয়ে থাকতে বল-সে তাই করবে! তুমি তাকে কনকনে শীতের রাতে এক গলা জলে ডুবে থাকতে বললে সে তাই করবে ! তুমি যদি তাকে মরুভূমির তপ্ত বালির ওপর দিয়ে গড়িয়ে যেতে বল - সেটাই করতে বাধ্য হবে !


           ( বিমল হো হো করে হেসে ওঠে )     

১৩ 
       
ছায়া    ।। হাসছো কেন? তুমি ভয় পাও না ? মৃত্যু ভয় এ ভীত নও?
বিমল   ।। হাস লাম হাসি পেল তাই। তবে তোমার প্রভু রা বড্ড কাচা চিত্রনাট্যের করে পৃথিবীর সবাইকে বোকা বানাতে চেষ্টা করেছে।
ছায়া    ।। চিত্রনাট্যের কাঁচা! তুমি দেখছ না লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষ স্বেচ্ছাবন্দি হয়ে ঘরে ঢুকে পড়েছে? ওদের অনেকেই বলছে যে প্রয়োজনে এক বছর দু'বছর বন্দী জীবন মেনে নেবে। বিনিময় অনন্ত জীবনের প্রতিশ্রুতি চায়।
ছায়া    ।। তাদের জন্য রয়েছে ১০ হাজার টাকার ভ্যাকসিন। বর্তমানে ওই ভ্যাকসিনের মার্কেটিং চলছে। আমি মানুষকে বলছি তোমরা কয়েক হাজার বছরের অভ্যাস গুলো বদলে ফেল। সামাজিক দূরত্ব তৈরি করে নিতে হবে। নইলে ভ্যাকসিনে কোন কাজ হবে না। কখনো কখনো শারীরিক দূরত্ব মেনে নিতে হবে।
বিমল   ।। (হাসি) ভূতের ভয় বিবর্ণ সুবিধাবাদী মধ্যবিত্তের দল তোমাদের যাদু মন্ত্রে মস্তিষ্ক বন্ধক রেখেছে! তাই বলে বাকি অংশ কে তোমরা কিন্তু হিপনোটাইজ করতে পারবে না ! ক্ষুধার জ্বালা বড় জ্বালা ? পেটে যখন আগুন জ্বলে তখন সেই আগুনে ব্যাকটেরিয়া ভাইরাস মরে যায় !
ছায়া    ।। আমার প্রভু বলেন মধ্য স্তরের ফুল বাবুদের দমন করতে পারলেই কেল্লা ফতে। এরা যেমন প্রভুর  চাটুকার হতে পারে আবার এদের মধ্যে থেকে একটা অংশ আছে যারা প্রভুর শাসন অমান্য করার আন্দোলন করে। এই অংশটা ডেঞ্জারেস।
বিমল   ।। আমাদের এই সাক্ষাৎকার পর্বটি আমি যদি পাবলিক করে ফেলি?
ছায়া    ।। আপনার কোন লাভ হবে না।
বিমল   ।। কেন ?
ছায়া    ।। কেউ তো বিশ্বাস করবে না। ভূত আর ভগবান এদুটো জিনিস আছে কি নেই এটা তো প্রমাণ করা যায় না। যারা বলে আছে তারা প্রমাণ করতে পারবে না। আর যারা বলে নেই তারাও প্রমাণ করতে পারবে না। তবে ভূত এবং ভগবান কে ভয় পাওয়াটা আছে। এটা প্রমাণ প্রমাণ করার দরকার নেই।
বিমল   ।। তুমি এভাবে আমার সামনে দেখা দিলে কেন?
ছায়া    ।। আপনি যে আমার ছবি আঁকবেন-তাই লোভ সামলাতে পারলাম না! ওরাতো আমাকে তৈরি করেছে ! আমার তো কোনো অবয়ব নেই! তাই কোনো ছবি নেই! ওদের কাছে ছবির প্রয়োজন নেই ! কিন্তু আমার কাছে আছে ! নিজেকে আয়নায় কেমন লাগে দেখতে ইচ্ছে করে! তাছাড়া আপনি প্রবীণ


           মানুষ ! সৎ মানুষ ! আপনার মধ্যে দয়া মায়া আছে ! তাই ভাবলাম আপনার কাছে নিজেকে প্রকাশ করলে আমার কোন ক্ষতি নেই ! এবার আমাকে যেতে হবে !

১৪

বিমল   ।। তুমি তো আমাকে কোন প্রশ্ন করলে না। তোমাকে আমি কেন ভয় পাই না এটাও তো তোমার জানা দরকার।
ছায়া    ।। আমার কোন জাগতিক প্রয়োজন নেই। আজ আছি কাল থাকবো না। আমার প্রভুরা তাদের কাজ হাসিল হয়ে গেলে আমাকে অন্তরালে পাঠিয়ে দেবে। তবে যাবার আগে একটা কথা স্বীকার করে যাই। আমি ভীতিপ্রদ। আমি মূর্তিমান ত্রাস। তাই বলে আমি কাউকে মেরে ফেলতে পারিনা। সে শক্তি আমার নেই। ওরা আমাকে সে শক্তি দেয়নি। আমাকে এখন যেতে হবে। চলি। যাবার আগে আর একটা দুঃখের কথা আপনাকে বলে যাচ্ছি। কোটি কোটি মানুষ মারা যাবে। আতঙ্কে নয়। খিদের যন্ত্রনায়। না খেতে পেয়ে মৃত্যুর মিছিল চলবে। অথচ এই মৃত্যুর জন্য আমি দায়ী নই।

[ ছায়ামূর্তি অদৃশ্য হয়ে যাবে। বিমল যেন স্বপ্নের ঘোরে ছিল সেখান থেকে বেরিয়ে এসে দেখবে যে সে তার বাড়ির সেই অংশটাতেই রয়েছে যেখানে সে আগে ছিল। রঙ তুলি ক্যানভাস নিয়ে ছবি আঁকা শুরু করবে। নেপথ্যে আবহসংগীত আসবে। ভেতর থেকে আবার উমা বেরিয়া আসবে। তার হাতে ফোন ]

উমা    ।। এই শুনছো মেয়ে আবার ফোন করেছিল--তোমার  ভাইয়ের মৃতদেহ কেউ ছুঁতে চাইছে না! পুলিশ সরে গেছে ! শ্মশানে নিয়ে যাবার জন্য একটা অ্যাম্বুলেন্স বা সব বাহক গাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না! কি হলো আমার কথা কানে যাচ্ছে? তোমার ভাইয়ের মৃতদেহ কি খড়্গপুরের ওই বাড়িতে পচে গলে দূষণ ছড়াবে ? তুমি কি একবার খড়্গপুরে যাবার চেষ্টা করবে ?
বিমল   ।। কটার মৃতদেহ পচনের হাত থেকে উদ্ধার করতে পারবে উমা ? দেশের আনাচে কানাচে আমার ভাই ওমরের মত হাজার হাজার মৃতদেহ এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়েছে! কারো কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই ! আফসোস নেই। হাহাকার নেই। সবাই যে স্বেচ্ছাবন্দি। নিজের মৃতদেহ টাকে আগলে রাখার ব্যর্থ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

(উমা স্বামীর কথা বুঝতে পারেনা। সে বিরক্ত হয়। চঞ্চল হয়ে ওঠে। বিমল ছবি আঁকা তে মন দেয়।)

উমা    ।। (ফোনে কথা বলে) সুমি সুমিরে আমি এখন কি করবো কিছুই বুঝতে পারছিনা! তোর বাবা কে খড়গপুরে পাঠাতে পারবো কিনা জানিনা ! ভোর না হওয়ার আগে গাড়ির ব্যবস্থা করাও যাবে না ! যদি বা ব্যবস্থা করা যায় তা হলেও পুলিশ পারমিশন আরো কত কিছু যে করতে হবে- আরো অনেক কথা বলে যায়।
[সংগীতের সঙ্গে পর্দা নেমে আসবে।]

নাট্যকার - সুব্রত কাঞ্জিলাল
যোগাযোগ - ৮৯৮১৩৬১২৫৬/৯৮৩১৭০৮৩৯৬,
সাল - ২০২০,
সমস্ত সত্ত্ব সংরক্ষিত
Credit
Photo : Google

For the all News Update Please follow our Website www.tollybangla.com
Subscribe our Youtube Channel Tolly Bangla Youtube
Follow Us on Twitter Tolly Bangla twitter
Like our Facebook Page Tolly Bangla Facebook Page



( প্রিয় পাঠক / পাঠিকা , পোস্টটিতে  লাইক, মন্তব্য ও শেয়ার করুন এবং নিয়মিত আপডেট পেতে আমাদের পেজে লাইক করুন )

No comments

Powered by Blogger.